কবিতা বুলেটিন : ২০ এপ্রিল ২০২০


বর্ষ ১ : সংখ্যা ২
৭ বৈশাখ ১৪২৭ : ২০ এপ্রিল ২০২০

সম্পাদকীয়
পৃথিবী মহামারী আক্রান্ত। জানি না কী হবে। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, মারা যাচ্ছে। তার পাশাপাশি লক্ষ্যণীয়, প্রকৃতি মানুষের নির্যাতনের হাত থেকে ক’টা দিন রেহাই পেতেই সেজে উঠেছে নতুন রূপে। বন্য প্রাণীরা যেন আনন্দে আত্মহারা। কিন্তু মানুষ? তার কী ভবিষ্যৎ?

জগতের সকল প্রাণীকূলের মঙ্গল হোক। এমনটাই কামনা করি।

ধন্যবাদান্তে
সম্পাদক
ইমেল: saniasumat@gmail.com


পুনঃপ্রকাশ

দাশবাবুকে
ভাস্কর চক্রবর্তী

আমরা বেঁচে থাকি কিংবা মরে যাই, দাশবাবু, এসে যায় না কিছু
যে যার ঘামাচি নিয়ে সবাই ব্যস্ত এখন।
যা কিছু দেখেছি তা কি বলতে পেরেছি ঠিকঠাক
যা লিখেছি, দশ বিশ বাইশ বছর, বোঝাতে পেরেছি কিছু?
শুধু বেঁচে থাকা নিয়ে বেঁচে থাকা শুনতে পাই শিল্পময় খুব
সেসব আমার জন্য নয়
কবিতার জন্য দাদা আমাদের রঘুনাথ রইল, আমি বেরিয়ে পড়লাম।


বুলেটিনের কবিতা

নির্ঝর নৈঃশব্দ্য

ঋ! আমার চোখ ঘষতে ভালো লাগে
চোখের নিচে চোখ, তোমার চোখের সুখ হোক
ঋ! আমার ফুল খেলতে ভালো লাগে
ফুলের নিচে যাই, তোমার বুকে রক্তজবার ছাই
ঋ! আমার পথ টানতে ভালো লাগে
পথের পায়ে হাঁটি, তোমার মেঠো পথের মাটি
ঋ! আমার ঘর ভাঙতে ভালো লাগে
ঘরের নিচে ঝড়, তোমার শিরায় কাঁপি নির্ঝর


অরুর জন্য কবিতা
সোয়েব মাহমুদ

বহুদিন হয়ে গেলো অরু,
সন্ধ্যের বুকে মনখারাপ পুষে
আমি তাকিয়ে থাকি- তাকিয়ে থাকি আকাশের দরোজায়,
আমি বাতাসের জানলা খুলে নাক ডুবিয়ে
রাখি,
যদি শহরের ঠোঁটে পাওয়া যায়,
হারিয়ে ফেলা ভ্যাপসা মাটির গন্ধ।
যদি স্মৃতির আঙুরলতায় ভর করে
আবার, আবার পাওয়া যায়
জাদুঘর থেকে দর্শণীমুক্ত আগুন লাগা
দামেস্ক হৃদয়।

অরু,
আমি কবরের মাটিতে শুয়ে আছি,
আমি কবরের মাটিতে শুয়ে থাকি,
আমার বেচে থাকায় ভয় করতে করতে,
হাতের রেখায় না থাকা জীবন্মৃত উপহাস,
আমি আপন করে নিয়েছি।
আমি কবরের ভেজা মাটিরচাপ নিতে পারছিনা,
বুক ভেঙে যাচ্ছে পলকা তাপে।
আমার সামনে সম্প্রচারিত হচ্ছে পুনঃপ্রচার বিধিমালা লংঘণ করা পাপ,
সম্প্রচারিত হচ্ছে একলা একা অভিশাপ,
আমি দেখতে চাচ্ছিনা- অরু-
আমি শুনতে চাচ্ছিনা-

কে কার ধরেছে হাত?
কার বুক থেকে উড়ে গিয়ে আধুনিকা
মুখ ঢাকে কার?
কার হৃদয়, মাছেদের পাখিদের সমাবেশ ছেড়ে
হেটে যায় মিথ্যের হেরেমে,
সত্যগোপনের ভ্রুণে?
কে কার পদচিনহে আলোর পরকীয়ায়
নাক চেপে পাড়ি দেয় মাটির কবর?

হাহ
অরু দেখলে আমি শাশ্বত জলের মতন
তাবৎ প্রেমিকাদের শাড়ির জমিনে
একদিন
" পৃথিবীর সন্ধ্যাকালীন খাদ্যতালিকায় একদিন ঢুকে পড়বে পরাস্ত প্রেমিক,
একদিন মানুষের পানীয় হবে রক্ত,
পরাভূত মানুষের রক্ত।!"

অরু রাস্তাটা কোনদিন পথ হয়ে উঠবে না,
এটাই কি তবে ব্যর্থতার শিরোস্ত্রাণে,
ফুটে ওঠা একমাত্র ইতিহাস- ভালোবাসার?

হয়তো...


চোখের নিচে চাঁদ
সাম্য রাইয়ান

পথ ভুলে যাই হলুদ বাতি দেখে।
রাত কি ফুরিয়ে যায়নি তবে!

শহর ঘুরে এলাম
কারও সাথে দেখা হয়নি।
যেমন হয় না তোমার সাথে
বহুদিন।

কার পাশে ঘুমিয়েছি
মনে থাকে না।
দাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছে।
সামান্য বাতাশেই বুক কেঁপে ওঠে।

রাতের চোখজুড়ে
হলুদ আলোর ঝড়।

জাগছে চোখের নিচে চাঁদ
আর ক্ষুধা বেড়ে যাচ্ছে।


ভেন্টিলেটর
দেবাশীষ ধর

ঘুম আসেনা, বিছানার এপাশ ওপাশ ছটফটানি।
একটা কালো বিড়াল প্রতিরাতে জানালা দিয়ে ঢুকে,
বিড়ালের সাথে বন্ধুত্ব হয়ে যায় নিরালায়। চোখের নিচে
কালো দাগের উপর প্রেমিকারা হেঁটে যায় নগ্ন হয়ে
তখনি দেখি নাকের উপর ভেন্টিলেটরের নল মধ্যরাতে
হঠাৎ কালো বিড়ালটি আমার বিছানায় উঠে বসে,
চুপি চুপি নাকের কাছে এসে আগ্রহী হয়ে দেখে যন্ত্রটি
ডিউমলাইটের আলোয় সমুদ্রে মরা লাশ ভাসতে দেখি
একটা কচ্ছপ এসেছে লাশ খেতে গত এক সপ্তাহ ধরে
কিছুই খায়নি।ভয় পেল যন্ত্রটিকে বিড়ালটি লাফ দিল
খাটের তলায় গেল পায়চারীর শব্দ বমি করলো সে।
কোথায় যেন শঙ্খ বাজে নিমের গন্ধ ভেন্টিলেটর ভেদ করে,
রাতে এখন আর কাক ডাকেনা,ভোরবেলায় শালিকের দল ছুটে
পাশের বাসায় উত্তম-সুচিত্রার রোমান্টিক জড়াজড়ি দেখে
রুমের উপরে ভেন্টিলেটরে জোড়া শালিকের শব্দ শোনা গেল,ভয়ে
বিড়ালটি চলে গেল জানালা দিয়ে সম্ভবত পাশের বাসার জানালায়।


নববর্ষ উপলক্ষে লেখা

বঙ্গাব্দ তুমি কার?
জ্যোতি পোদ্দার

যে কোন ভাবাদর্শের নিজস্ব চিন্তার কর্মতৎপরতা নিয়ে তার নিজস্ব পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার থাকে। হোক সে জাতিবাদি রাষ্ট্রের বা রাষ্ট্রের অন্তর্গত যেকোন ভাবাদর্শের।

হিসাব নিকাশের জন্য পঞ্জিকা ছাড়া কোন পথ নেই।বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় খ্রিষ্টীয় পঞ্জিকা দ্বারা আমি আমরা শাসিত। সে আপনি চান বা না চান তাতে কিছুই যায় আসে না।

যে কোন সাল বা সনের শুরুতে কোন না কোন মহান ব্যক্তির জন্ম বা চিন্তার সাংবাৎসিক কাঠামো দেখি।কোন কোন সাল আর্য দ্বারা শাসিত যেমন বিক্রমাব্দ, লক্ষনাব্দ শকাব্দ, কোনটা বিদেশী প্রভাবে যেমন হিজরি, খ্রিষ্টীয় আবার কোনটা ব্যক্তি জন্ম ও তার কর্ম দ্বারা শাসিত যেমন চৈতন্যব্দ,অশোকাব্দ আবার কোনটা শংকর-- দেশিয় ও তৎকালিন কেন্দ্রের শাসকের দ্বারা শাসন কাঠমো পরিগঠিত করার জন্য যেমন ইলাহি অব্দ, বঙ্গাব্দ।

যে কোন সাল পরিগঠিত হোক না কেন তার শরীর ও আত্মায় কুটস্থ থাকে জন মানুষের বিশ্বাস সংস্কৃতি ধর্মাশ্রিত ভাব ভাবনার বয়ান। থাকে জন গোষ্টি পরিচালিত করবার ও খাজনা তথা আর্থনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবার হদিশ। নিছক কোন পঞ্জিকা হয় না। হতে পারে না।
আর যে কোন পঞ্জিকার দিন তারিখ বার তিথি কালবেলা মাহেন্দ্রক্ষণ গনিত হয় নিদির্ষ্ট হিসাবকে আশ্রয় করে। সাধারনত তিনভাবেই হিসাব গণিত হয়। এক সৌরমান দুই চান্দ্রমান তিন নক্ষত্রমানকে আশ্রয় করে।

একটু আচালেই বোঝায় যায় কে কোন মানকে ধরে হিসাব তথা পঞ্জিকা পরিগঠন করছে তা নির্ভর করছে ঐ ব্যক্তি বা জনগোষ্টির স্থান কাল এবং তার ইতিহাসের অবস্থান দ্বারা।
যেমন হিজরি সন। বা পারস্যের বা মিশরের ক্ষনগননা পদ্ধতি।

বাংলা সন একটি শংকর সন। এর আর্বিভাবের নিদির্ষ্ট কার্যকারন আছে।তার রাজনৈতিক বোঝাপড়া আছে। আছে বাংলা অঞ্চল রাজনৈতিক ভাবে পরিগঠিত হবার আগাম পূর্বাভাস।

আজকাল প্রায়ই শুনি বঙ্গাব্দ হিন্দুদের। নববর্ষ হিন্দুদের।বাংলা সন হিন্দুদের। সত্যি কী তাই? অথচ হিন্দু শব্দটি এই সেদিনের। একটি জনগোষ্টী "স" "হ" উচ্চারনের দোষ/গুণের কারণে সিন্ধু থেকে হিন্দুতে রূপান্তরিত হলো তার ইতিহাস অজানা নয়। নয় হাল আমালের হিন্দুত্ববাদি রাজনীতি। কিংবা তার আগে হিন্দু জাতিয়তাবাদির মাঠ তৈয়ারের কাহিনী।

যাক সে কথা। সব সাল বা সন ব্যক্তি কেন্দ্রিক, একমাত্র বঙ্গাব্দ তামাম ভুমিকে আশ্রয় করে পরিগঠিত।

বাংলা অঞ্চলকে কে না শাসন করেছে? বঙ্গ অপাঙক্তেয়। পান্ডব বর্জিত এলাকা। নমশুদ্রের ঘিঞ্জি বসত ভিটা।বর্ণবাদি ব্রাহ্মনদের নাক ছিটকানো অঞ্চল। তদ্রুপ ভাষা। বঙ্গজননির বয়ান অচ্ছুত। রাজদরবারে তার ঠাঁই নেই। নগরের বাইরে তার বসত। ডোম চাষা কৈবর্তের ভাষা।
সেই ভাষা ও তার তামাম বঙ্গ নামে বঙ্গাব্দ হওয়ার নিশ্চয় তাৎপর্য আছে।ভাষা কেন্দ্রিক রাষ্ট্রকাঠামো নির্মানে নিশ্চয় বঙ্গাব্দ গঠনের ভুমিকা ও তাৎপর্য রয়েছে। নিছকই তো কোন কিছু হয় না। হতে পারে না। সূত্রায়ন কোথাও না কোথাও হয়ই।

এই পাক ভারত উপমহাদেশ ইসলামের অার্বিভাব একটি ঐতিহাসিক ভুমিকা রয়েছে। ইসলামের সাম্য ধারনা বর্ণবাদাশ্রতি সমাজকে গতিশীলতা দান করেছে। এ অঞ্চলের অন্যন্যা মুসলিম শাসকের মতো মোগলদের ভুমিকা কোন অংশেই কম নয়।

যে সাম্রাজ্যের সুচনা বিন্দু বাবর সেই মোগল শাসনামলের শাসক সম্রাট আকবর গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছেন বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করে। তার নির্দেশে তার রাজসভার জ্যোতির্বিজ্ঞানি ফতেহউল্লা সেরাজ হিজরি সনের সাথে মিলিয়ে তৎকালিন সনের সংযুক্ত করেই বঙ্গাব্দের সূচনা করেন।বঙ্গাব্দ হিজরি সনের বিবর্তিত রূপই বঙ্গাব্দ।

এখানে বলে রাখা দরকার তখন কিন্তু এ সনের নাম ছিল ফসলি সন। গ্রামিন কৃষি ও খাজনা আদায় লক্ষ্য ছিল। দুটো ভাবার্দশের সন্মেলিত রূপ বঙ্গাব্দ। নিশ্চয় আপনারা হিজরি সনের তাৎপর্য জানেন।কখন কে কোন কারনে এই সনের প্রবর্তন তা জানা বোঝা জরুরি।
বঙ্গাব্দকে অস্বীকার করা মানেই আকবরের ঐতিহাসিক ভুমিকাকে অস্বীকার করা। হিজরি সন প্রবর্তনের সামাজিক সাংস্কৃতিক রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে ব্যর্থ হওয়া।যে বঙ্গ ও বঙ্গভাষা পরবর্তিতে বাংলাভাষা আন্দোলন ও রাষ্ট্রগঠনের পরিক্রমকে হৃদয়দিয়ে বোঝার ব্যর্থতা।

সমকালিন বাংলাদেশে বিগত বছরগুলোতে জনমানুষের মনোভুমিতে বঙ্গাব্দ নিয়ে ব্যঙ্গ বিদ্রুপ ও অস্বীকার ও বঙ্গাব্দের অজর্নকে সকল বাংলা ভাষাভাষি মানুষের নয়-- তা একটি জনগোষ্টির দিকে ঠেলে দেয়া মুলত তার ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে অস্বীকার করা।

অন্যদিকে আসুন দেখে আসি হিন্দু নামাঙ্কিত সনাতনীদের কাজ কারবার। হিন্দু পরিবারের ধর্ম কর্ম স্মার্ত পন্ডিত প্রবর লোকানাথ পঞ্জিকা দ্বারা শাসিত।জন্ম তিথি থেকে শুরু করে বিয়ের লগ্ন অন্নপ্রাশন শ্রাদ্ধশান্তি সীমান্তোন্নয়ন সব কিছু পঞ্জিকা দ্বারা শাসিত। বর্তমানে প্রচলিত লোকনাথ পঞ্জিকায় তারিখ বার তিথির ভিন্নতা রয়েছে। পঞ্জিকাপ্রণয়ন কমিটি প্রথমে নিজস্ব তারিখ দিয়ে পরে লিখেছে বাংলাদেশ মতে। হিন্দুরা তাদের নিয়ম পালনের ক্ষেত্রে প্রথমটি পালনে সচেষ্ট।

: কাজে কাজেই ১লা বৈশাখ থেকে শুরু করে সব কিছুতেই তারিখের ভিন্নতা বিদ্যমান।প্রথম তারিখটা মনে করে তাদের নিজস্ব দ্বিতীয়তা বাংলাদেশের। একটি স্বাধীনদেশের যে নিজস্ব তারিখপত্রিকা থাকতে হয় এবং সেই অনুযায়ি কর্তক্যকর্ম নির্দ্ধারন যে নাগরিকের পবিত্র কর্তব্য তা তারা ভুলে গেছে।

রাষ্ট্রিক রাজনীতি বিবর্জিত ধর্মীয় যাপন করছে।
পশ্চিম বাংলার বাংলাভাষা একটি বৃহৎ রাষ্ট্রের প্রাদেশিক ভাষা। আর বাংলাদেশ একটি স্বাধীন সত্তা। তার পঞ্জিকা আলাদা হতে বাধ্য।ভাষা আন্দোলনের তাৎপর্য বহুরৈখিক। সেটি পালন ও কার্যের অভিমুখ খুলে দিতে জাতিবাদি নেতারাও ব্যর্থ হয়েছেন।
বঙ্গাব্দ নিয়ে নিয়ে ফেকরা এক নয় বহুকিসিমের।সমস্যাটা হচ্ছে ইতিহাস যে শুধু মাত্র মৃত মানুষের জন্ম তারিখ নয় সে যে একটি সপ্রান সত্তা তার শিক্ষা আমরা পাইনি। ইতিহাস কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। তার প্রয়োজনীয় উপাদান নিজেই সংরক্ষন করে। নিজেই মানুষের ভেতর দিয়ে কাজ করে ঠিকই শিক্ষা দেন।
সুতরাং বঙ্গাব্দ তুমি এই বাংলাদেশের। তুমি বাংলা ভাষাভাষী সকল মানুষের।