দ্রোহপুরুষ মলয় রায়চৌধুরী : ডক্টর বিষ্ণুচন্দ্র দে


মলয় রায়চৌধুরী একজন দ্রোহপুরুষ । দ্রোহপুরুষ শব্দটা অভিধানগত নয় । দ্রোহ’র সঙ্গে পুরুষ যুক্ত করে দ্রোহপুরুষ করা হয়েছে । দ্রোহ অর্থে বিরুদ্ধাচরণ, অনিষ্টচিন্তা, শত্রুতা, অপকার, পরাভব, শাসন না মানা, ইত্যাদি । বলা চলে দ্রোহপুরুষ মানে ব্যতিক্রমী, আলাদা, সাহসী, প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, জকমখোর, বিদ্রোহী, বিপ্লবী, নবাঞ্চলের সন্ধানী, গতানুগতিকতার বিরুদ্ধাচারী ইত্যাদি। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় Rebel…”a person who rebels, rise in opposition or armed resistance to an established government or ruler”. He-man অর্থেও দ্রোহপুরুষ বোঝালে ভুল হবে না । যিনি ব্যতিক্রমী, তিনি সাহসী, শক্তিশালী, তাঁ র অনেক ক্ষমতা । তিনি নিম্নসীমা ও উচ্চসীমাকে অতিক্রম করার সাহস রাখেন । অনেকে শুধু একটা সীমা লঙ্ঘন করতে পেরেছেন । যেমন রবীন্দ্রনাথ উচ্চসীমা লঙ্ঘন করেছিলেন । র‌্যাঁবো নিম্নসীমা লঙ্ঘন করেছিলেন ।কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী দুটো সীমাই লঙ্ঘন করতে পেরেছিলেন বলে তিনি বাংলা সাহিত্যে যথার্থই দ্রোহপুরুষ ।

মলয় রায়চৌধুরী একজন দ্রোহপুরুষ, তার কারণ ১) তিনি প্রতিষ্ঠানবিরোধী ও আধিপত্যবিরোধী । ২) তিনি প্রথানুগ মতবাদের তোয়াক্কা করেন না । ৩) তিনি নিজের পপতিস্বকে আত্মনির্ভর করে তুলেছেন । ৪) তিনি চলিত রীতি-নীতিকে অবজ্ঞা করেন । ৫ ) তিনি সাহিত্য-সংস্কৃতিতে অভ্যুথ্থান ঘটান এবং এ-ব্যাপারে কর্তৃত্ব অস্বীকার করেন । ৬) তিনি বাম ও ডান উভয় অন্যায়ের সঘোষ বিরোধিতা করেন । ৭) তিনি চাপ বরদাস্ত করেন না, ইত্যাদি ।

রবীন্দ্র গুহ ‘দ্রোহপুরুষ’ সম্পর্কে বলেছেন, “যিনি বুকে বারুদ জ্বালিয়ে নিজেকে দহন পীড়ন সৃজন করেন, জীবনচর্চার মূল ধরে নাড়া দেন । কর্মের ও চরিত্রের দুঃখস্বত্ব বোঝেন, প্রাণের বিপর্যস্ত রূপ, বিলাস-বিস্ময়, আচম্ভা দাপট, আঁতাতহীন হিংস্রতা, বিষাদ, হতাশা, ভরা যৌবনের শূন্যতা, অগ্নিতাপ ও মোইনী ভালোবাসার স্পর্শ পেয়েছেন, বুকে যাঁর সাঁ-সাঁ ধুনন, তিনিই দ্রোহপুরুষ।” মলয় রায়চৌধুরীর ক্ষেত্রে দ্রোহপুরুষ কথাটা প্রয়োগ করার অনেক যুক্তি বর্তমান । কারণ তিনি স্বতন্ত্র, ব্যতিক্রমী, আলাদা । তিনি সমস্ত শাসনকে ভাঙার শক্তি প্রদর্শন করেছেন । বাংলা সাহিত্যে ইশতাহার-ভিত্তিক আন্দোলন যে করা যায়, তা প্রত্যক্ষত দেখিয়ে দিয়েছেন । সেই সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন তিনি । বাংলা কাব্যে পালা বদলের মন্ত্রগুরু মলয় রায়চৌধুরী । প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার মাধ্যমে গোষ্ঠীবদ্ধ সাহিত্যচর্চার বীজ বপন করে বাংলা কাভছ সাহিত্যে নতুন মাত্রা সংযোজন করেছেন মলয় রায়চৌধুরী । শুধু নাই নয়, নান্দনিকতার গণ্ডি ছাড়িয়ে, জীবন উপলব্ধির কাব্য-বয়ন করেছেন তিনি । অশ্লীল শব্দ, যৌন শব্দ ইত্যাদির অবাধ প্রচলন দ্বারা বাংলা কাব্য সাহিত্যকে দিগন্তবিস্তারী চিন্তা জগতে ঠেলে দিয়েছেন । মুর্শিদ এ এম বলেছেন, “মাতব্বর কোনো কাগজে একেবারেই না লেখা দু-একজন লেখকের অন্যতন মলয় রায়চৌধুরী ; কবি ভাবুক ও দ্রোহপুরুষ, হাংরি আন্দোলনের সূচনা করে  কবিতার কলোনিয়াল এসথেটিকসকে আছড়ে কোনও নবাঞ্চলে চালিত করেছিলেন বা করে চলেছেন।”

মলয় রায়চৌধুরী যে বাংলা সাহিত্যাকাশে দ্রোহপুরুষ বলে আখ্যায়িত, সে সম্পর্কে বিদগ্ধজনের ভাষ গ্রহণযোগ্য, যেমন : ১) “সংক্ষেপে এটুকুই বলা চলে যে মলয় রায়চৌধুরী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়েই যুদ্ধে নেমেছিলেন।” — উৎপলকুমার বসু । ২) “মলয় শৈশবে পাটনায় ক্রিমিনাল এলাকায় থাকত । গলিতে গুলি-লাট্টু খেলত । পড়তে বসে লন্ঠনের কাঁচে আরশোলা চেপে ধরত । এভাবেই অর্থশাস্ত্রে এম এ পাশ করল । মগজে মার্কসবাদ ঢুকলো । জট ছাড়াতে-ছাড়াতে হারাধন ধাড়ার ঠিকানায় পৌঁছে গেল । হাংরির ক্রিয়েটর হল।”— রবীন্দ্র গুহ । ৩ ) “বাংলা কবিতার নান্দনিকতার পাঠ পালটে দেবার মানসে মলয় রায়চৌধুরী ও তাঁর সহযাত্রীগণ সমকালীন সাহিত্যে নিয়ে আসেন এক উদ্দীপনাময় মলয়প্রবাহ।”— নুরুদ্দিন জাহাঙ্গীর । ৪) “বাংলা কবিতার স্বনির্বাচিত পুরোহিতদের কাছে আন্দোলনের বলিষ্ঠ বিদ্রোহ মোটেই সুখপ্রদ হয়নি । মলয়ের উপর মানসিক শারীরিক নানারকম অত্যাচার হয়েছিল।”—কামাল হোসেন । ৫) “ ভষ্ম-অপমান শয্যা থেকে আজ যিনি ফিরে এসেছেন তিনি একা মলয় । সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলি, অর্থাৎ আইন-আদালত-প্রশাসন, এমনকি কবিতার বড়ো মেজো সেজো ছিটমহলও এককাট্টা হয়ে যায় তাঁর বিরুদ্ধে।”—দিব্যাংশু মিশ্র । ৬) “প্রতিষ্ঠানের প্রভু ও দালালদের কাছে মলয় রায়চৌধুরী এক ভীতি উদ্রেককারী নাম।”— নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায় । ৭) “এই সময়ের প্রকৃত দ্রোহপুরুষ মলয়।”—অজিত রায় । ৮) “মলয় সম্পর্কে আজিজুল হকের মন্তব্য ছিল তিনি পেরিফেরির জীব।”—অজিত রায় । ৯) “হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনের প্রবক্তা কবি-সাহিত্যিক মলয় রায়চৌধুরী শুধু বিতর্কিত পুরুষই নন, পরন্তু তিনি প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার বার্তাবাহক হিসেবে আজকে বেশি উজ্বল ও সুপরিচিত ।”—মোহিনীমোহ গঙ্গোপাধ্যায় । ১০ ) “জেহাদ গোষণা, ক্ষুধিত মানুষের জীবনযন্ত্রণার সাথে সাহিত্যের একটা মেলবন্ধন ঘটানোর সার্থক প্রয়াস তাঁর মধ্যে অবিরাম দেখা যায় । আসলে মলয় দীর্ঘদিনের অচলায়তনের প্রাচীর ভেঙে চুরমার করে নিজস্ব ঘরানায় বাংলা সাহিত্যের ভাণ্ডারে অভিনব, গতিশীল একটা দিক বিকশিত করার খেলায় মেতেছিলেন।”—সুনীল মণ্ডল । ১১ ) মলয় রায়চৌধুরী নামক একটা নামই তাবৎ এসট্যাবলিশমেন্ট নামক মেকি সাহিত্যের শেকড়ে ধরাতে পারে অমোঘ পচন । এবং সেই কারণেই এসট্যাবলিশমেন্ট বরাবরই মলয়কে সরিয়ে রাখতে চেয়েছে জনমানস থেকে কিছি অপ্রয়োজনিব বিশেষণ যোগ করে।”—সুপ্রিয় বাগচি । ১২ ) “কেন বলা যাবে না মলয় এক অগ্নিপুরুষ । সে স্বয়ং অগ্নি ।”—পিনাসী রাজস্হানী। ১৩ ) “দেশে দেশে যখনই স্রষ্টার কলম নিয়ে নতুন পথের পথিক হতে চেয়েছেন যে সব কবিরা, তখনই অগ্নিশর্মা হয়ে বাধাস্বরূপ দাঁড়িয়েছেন চিরাচরিত ভাবধারায় আচ্ছন্ন ছুঁৎমার্গীরা । হাংরি জেনারেশনের প্রধান পুরোহিত তাঁর সময়কালে যে নতুন সাহিত্যপথের পথিক হয়ে ছুঁৎমার্গীদের কোপে পড়বেন এটাই স্বাভাবিক। এজন্য স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরীকেও শ্রীঘরের অতিথি হতে হয়েছে ।”—শীতল চৌধুরী । ১৪ ) “আমার মলয়কে অন্যভাবে একজন সন্ত বলে মনে হয় । যে পাপ করে, করার কথা বলে, অথচ ভেতরে ভেতরে গভীর পূণ্যসন্ধানী।”—তপনকুমার মাইতি । ১৫ ) তিনি কারুর ধার ধারেন না, যেখানে সত্যরক্ষা তাঁকে করতে হবে, সেখানে সৌজন্য ইত্যাদির ট্যাবু তিনি ভাঙতে চান । কিন্তু শত্রূস্হানীয়রাও জানেন তিনি মহাশক্তিমান।”—শঙ্করনাথ চক্রবর্তী ।

‘হাংরি’ শব্দের মধ্যেই আমরা দ্রোহের ইঙ্গিত লক্ষ্য করি । মলয় রায়চৌধুরী হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা এবং একই সঙ্গে তিনি দ্রোহপুরুষ হওয়ার ফলেই বলতে পারেন, “কবিতা সতীর মতো চরিত্রহীনা, প্রিয়তমার মতো যোনিহীনা, ঈশ্বরের মতো অনুন্মেষিনী”। তাই মলয় রায়চৌধুরীর ভাবনার শক্তিচেতনা একক গণ্ডি ছাড়িয়ে গোষ্ঠীচেতনার রূপ নেয় হাংরি সাহিত্যিক মুক্তাঙ্গনে । সেইজন্য “তুমি ডায়াসপোরিক, তুমি কৃষ্টিদোগলা ! তোমার কলমে ছোটোলোকের রক্ত । তোমার টেক্সট আলাদা । তফাৎ হটো তুমি । এবং কলকাতা মলয়ের সঙ্গে সমস্ত শরোকার ছিন্ন করে।” ( অজিত রায় ) । দ্রোহপুরুষকে সকলেই ভয় পায় আবার অন্তরে শ্রদ্ধাও করে প্রচণ্ডভাবে । তাই নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে অপরাধ জেনেও অনেকে মলয় রায়চৌধুরীর মতো প্রতিভাবান লেখককে জেলে পাঠান ।

মলয় রায়চৌধুরী প্রতিভাবান, স্বতন্ত্র, সবার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা । তাঁর বাস্তব জীবনদর্শন যেমন স্বতন্ত্র, তেমনি সাহিত্যিক হিসেবেও স্বতন্ত্র । বাস্তব জীবনে তিনি সত্যভাষি, নির্লোভ, হৃদয়বান, আন্তরিক, পরোপকারী, প্রচারবিমুখ । তাঁর শৈশব কেটেছে ছোটোলোকদের পাড়ায় । সে পাড়ায় শিক্ষিত বলতে প্রায় কেউ ছিল না । সকাল থেকে পাড়ায় বাড়িতে-বাড়িতে মদের আসর বসত, সন্ধ্যায় নারীদেহের চেখে দেখতে ভিড় জমত, আমাদের অনভ্যস্ত ভাষায় গালিগালাজ হতো । সেখানে তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী প্রথম কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া । এমনিভাবে যে যুবকের শৈশব অতিবাহিত হয়েছে, সে অবশ্যই সমাজ ও ঘুণধরা বুদ্ধিজীবিদের চিন্তাকে ঝাঁকুনি দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আস্ফালন করবেনই । তাঁর দাদা সমীর রায়চৌধুরী মামার বাড়িতে থেকে পড়াশুনা করার ফলে এত তীক্ষ্ণ ও দ্রোহপুরুষ হবার ক্ষমতা অর্জন করতে পারেননি । অবশ্যই একজন মানুষের বড়ো হওয়ার মধ্যে তাঁর জীবননির্বাহ ও পার্শ্ব-পরিবেশ প্রত্যক্ষত দায়ি । তাই তাঁর কাব্যে উঠে এসেছে বাস্তব অভিজ্ঞতা, যা অশ্লীল বলে আখ্যায়িত । এখানেই মলয় রায়চৌধুরীর নিজস্বতা, এখানেই  তিনি স্বতন্ত্র ।

মলয় রায়চৌধুরীর পূর্বেও বাংলা কাব্যে অনেক তথাকথিত অশ্লীল লেখা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, যেমন বড়ু চণ্ডীদাসের ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’, রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রায়ের ‘বিদ্যাসুন্দর’, বুদ্ধদেব বসু ও মোহিতলাল মজুমদারের অনেক কবিতা তথাকথিত অশ্লীলতা দোষে দুষ্ট ; সাম্প্রতিক কালে বিনয় মজুমদারের ‘ভুট্টা সিরিজের কবিতা । । কিন্তু তার জন্য কেউই কারারুদ্ধ হননি । আসলে দ্রোহপুরুষ বলেই এই কারাদণ্ড তাঁর অদৃষ্টগত । মলয় রায়চৌধুরী কারারুদ্ধ হয়েছিলেন বলেই হাংরি আন্দোলন বেশি প্রচার পায় । পরবর্তীকালে যাঁরাই নিজেদের হাংরি আন্দোলনকারী হিসাবে ঘোষণা করেছেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র মলয় রায়চৌধুরী সব দিক থেকেই শক্তিশালী প্রতিভার পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন । বাকিদের কেউ প্রতিষ্ঠানের চক্রব্যূহে অন্য জগতে চলে গেছেন, কেউ মলয় রায়চৌধুরীকে সহ্য করতে না পেরে তাঁর বিরুদ্ধে কুৎসা রটিয়েছেন, দল পাকিয়েছেন, নিজেদের হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা বলে ঘোষণা করেছেন । এতে সস্তা প্রচার মেলে বলেই এমন দলাদলি ও স্রষ্টার আসন নিয়ে ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা হয়েছে । হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা যে মলয় রায়চৌধুরী, সে সম্পর্কে বিশ্বাসযোগ্য কিছু তধ্য তা-ই প্রমাণ করে, যেমন—

১) সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : “প্রধান ভূমিকা নিয়েছিল মলয় রায়চৌধুরী । মলয় প্রথম শুরু করার পর শক্তি চট্টোপাধ্যায় তাতে যোগ দেয় এবং পরে উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ও পরিচিতদের মধ্যে অনেকে আসেন।” ( পদ্যগদ্য  সংবাদ, অক্টোবর ১৯৮৬ )

২ ) মিহির রায়চৌধুরী : “১৯৬১-এর শেষ দিকে প্রথম হাংরি বুলেটিনটি প্রকাশিত হয় । এই আন্দোলনের উদ্গাতা হলেন পাটনার মলয় রায়চৌধুরী।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ, অক্টোবর ১৯৮৬ )

৩ ) সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় : “হাংরি আন্দোলন শুরু করে সেই মলয় রায়চৌধুরী।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ, অক্টোবর ১৯৮৬ )

৪ ) রবীন্দ্র গুহ : “আমরা কয়েকজন মিলে একটা আন্দোলন গড়ে তুলেছিলাম । মলয় তার নাটের গুরু ছিল।” ( সম্পাদকের কথা, জখম, ১৯৬৫ )

৫ ) অজিত রায় : “বাংলা সাহিত্যের প্রথম আভাঁগার্দ আন্দোলন হাংরি জেনারেশন । এবং এই আন্দোলনের আদি ও পুরোধাপুরুষ তথা জন্মদাতা মলয় রায়চৌধুরী । অর্থাৎ হাঙ্গামার সর্বময় কর্তা মলয় রায়চৌধুরী, যিনি সেসময়ে অজ্ঞাত লেখক হলেও বাংলা সাহিত্যের পীঠস্হানে তুলতে পেরেছিলেন বিশাল ঝড় ।” ( গেরো ফাঁসগেরো)

৬ ) সমরজিৎ সিংহ : “মলয় নিজে এই হাংরিদের পুরোধাপুরুষ।” ( আন্দোলিত মলয়ের উহুরু )

৭ ) বিমলকুমার মুখোপাধ্যায় : “এক আন্দোলন বাংলা সাহিত্যে দেখা দিয়েছিল চারদিকে মাতন লাগিয়ে । এই আন্দোলনের স্রষ্টা মলয় রায়চৌধুরী।” ( বাংলা অ্যাকাডেমি পত্রিকা )

৮ ) উৎপল ভট্টাচার্য : “হাংরি আন্দোলন আজ ইতিহাস প্রসিদ্ধ । সেই আন্দোলনের প্রধান রূপকার ছিলেন মলয় রায়চৌধুরী।”

৯ ) আলম খোরশেদ : “ষাট দশকে কলকাতা তোলপাড় করা হাংরি আন্দোলনের কবি-পুরোহিত মলয় রায়চৌধুরী।” ( আহবকাল )

১০ ) তরুণ মুখোপাধ্যায় : “হাংরি আন্দোলনের অন্যতম নেতা মলয় রায়চৌধুরী।” ( স্বপ্ন পত্রিকা )

আমরা ঐতিহাসিক তথ্য স্বরূপ হাংরি আন্দোলনের প্রথম ইংরাজি ও বাংলা ইশতেহারে স্রষ্টা হিসাবে মলয় রায়চৌধুরীর নাম লিপিবদ্ধ দেখতে পাই । তাই স্রষ্টা নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকে না ।

মলয় রায়চৌধুরী প্রতিভাবান কবি । স্বতন্ত্র । সেই প্রতিভার গুণেই বাংলা সাহিত্যের ভিত কাঁপিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন তিনি । তাঁর পপতিভার গুণে মুগ্ধ হয়ে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার ‘কৃত্তিবাস’-এর কবি-সাহিত্যিক হয়েও মলয় রায়চৌধুরীর হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন । মলয় রায়চৌধুরী সৃষ্ট চোদ্দোধারা নিয়ম বিধিও মেনে চলতে বাধ্য হলেন । পরবর্তীতে যদিও এঁদের মধ্যে বিভিন্ন ব্যাপারে মতানৈক্য দেখা দেয়, এবং তাঁরা একে-একে সরে পড়েন । তখন হাংরি আন্দোলন আরও বেশি জোরদার হয়ে ওঠে । ভিড় করে মফসসল থেকে মেধাবী যুবকেরা মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিভার কাছে বশ্যতা স্বীকার করে হাংরি মন্ত্রে দীক্ষিত হন । যদিও ১৯৬৪-এর শেষের দিকে একটি হাংরি বুলেটিনকে কেন্দ্র করে মকদ্দমা ও জেল-হাজত হলে, ভয়ে বেশির ভাগই সরে পড়েন । কিন্তু অনেকে হাংরি আন্দোলনে যোগদান না করলেও, মলয় রায়চৌধুরীর মেধার তাণ্ডবে ভীতিপ্রদ হয়ে উঠেছিলেন ; তাই তাঁকে অশ্লীল কবি আখ্যা দিয়ে জেলে পাঠানো হয় ।

প্রশ্ন ওঠে, অশ্লীল কী ? সেসময়ে এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর কেউই দিতে পারেননি । অশ্লীলতার সংজ্ঞা কোথাও পাওয়া যায়নি । তাই মলয় রায়চৌধুরী কোর্টে টানা-হেঁচড়ার পর মুক্তি পেলেন । যারা মলয় রায়চৌধুরীর মেধাকে মান্যতা দিয়ে নিজের কাব্যপথকে স্পষ্ট করেছিলেন তাঁরা দ্রোহপুরুষটির বিরুদ্ধে গিয়ে মুচলেকা দিলেন যে, ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ কবিতাটি অশ্লীল । হাংরি কবিতায় অশ্লীলতা সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, “অশ্লীল যারা মনে করে, তারা ঠিক কবিতার বা সাহিত্যের পাঠক নন, তারা সামাজিক লোকজন।” ( ক্ষুধার্ত, ১৯৮১ ) । মলয় রায়চৌধুরীর ‘প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার’ সম্পর্কে আদালতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন, “আমি অবশ্য কোনো শব্দকে অশ্লীল মনে করি না।”

হাংরি আন্দোলনকারীদের টেক্সট থেকেও অনেক বেশি অশ্লীল লেখা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয় । তরুণ সান্যাল ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মে তারিখে মলয় রায়চৌধুরীকে একটি চিঠিতে লিখেছেন, “অশ্লীলতা তো রচনায় থাকে যখন কোনো বিশেষ অর্থে যৌনবোধ উদ্রেক করার জন্য প্রত্যক্ষ বা ইঙ্গিত কাজ করে । সেখানে উদ্দেশ্য ও উপকরণে উভয় ক্ষেত্রেই অশ্লীলতা দেখা দিতে পারে । যেমন ‘নবকল্লোল’ নামে একটি পত্রিকায় যার বিক্রয় সংখ্যা সম্ভবত বিপুল, তাতে বৈশাখ ১৩৭১ সংখ্যায় ‘যা নয় তাই’ নামে রচনায়  জনৈক অবধুত লিখেছেন । আসলে এঁদের পেছনে এসট্যাবলিশমেন্ট আছে — আপনাদের পেছনে নেই । আপনাদের ঢের বন্ধু সুড়ুৎ করে এসট্যাবলিশমেন্টে ঢুকে পড়ে আপনাদের ডেকে বলছে ‘বেয়াদব’।”

যাঁরা সৎ ব্যক্তি, সত্য কথনে যাঁদের সাহস আছে, তাঁরা মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিভাকে অবশ্যই স্বীকার করেন । তুণ সান্যাল বলেছেন “আমি আপনাকে প্রতিভাবান বলে মনে করি, যে প্রতিভার অভাব চতুর্দিকে বড়ই প্রকাশিত।” তিনি প্রতিভাবান, মেধাবী, স্বতন্ত্র । তাই তাঁর প্রতিভাকে স্বীকৃতি দিয়ে আখ্যায়িত করা হয় — প্রথম সারির কবি, আভাঁগার্দ কবি, পোস্টমডার্ন কবি, উত্তরঔপনিবেশিক কবি, নিরপেক্ষ কবি, অন্যতম কবি, তাত্বিক কবি, ভাঙচুরের কবি, দামাল কবি, জ্বালাময় কবি, আগ্নেয় কবি, নিম্নশ্রেণির কবি, ছোটোলোকি কবি, অশ্লীল কবি ইত্যাদি । একজন কবি সম্পর্কে এতগুলো বিশেষণ বোধহয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিরল । তাই এই আগ্নেয় কবিকে ‘দ্রোহপুরুষ’ বলতেই হয় ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় মলয় রায়চৌধুরীর প্রতিভার বন্যাস্রোতে ভীত হয়ে আমেরিকায় বসে ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন তারিখে এক চিঠিতে হাংরি আন্দোলন ভেঙে দেবার হুমকি দেন, আবার পরবর্তীতে স্বীকার করেন, মলয় রায়চৌধুরীর লেখা সম্পূর্ণ অন্য ধরণের । সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোর্টে মলয় রায়চৌধুরীর পক্ষে সাক্ষ্য দেন । আসলে বাংলা কবিতায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কর্নধার হিসেবে মলয় রায়চৌধুরীকে আখ্যায়িত করলে ভুল হবে । কারণ হাংরি আন্দোলনের পরবর্তী সময় থেকেই বাংলা কবিতায় পালাবদলের স্রোত বইতে লাগল । এক কথায় বলা যায়, বাংলা কবিতাকে তার আপন ভূমিতে সমৃদ্ধ করার ভগীরথ মলয় রায়চৌধুরী নামক দ্রোহপুরুষটি । তাই তাঁর কাছে শ্রেষ্ঠ লেখক, শ্রেষ্ঠ সাহিত্য, শ্রেষ্ঠ কবিতা, শ্রেষ্ঠ কবি ইত্যাদি ফ্রড বলে মনে হয় । মলয় রায়চৌধুরী শরিক কবি-সাহিত্যিকদের ভণ্ডামিকে চাবুক মেরে বলেন, “আমি আবার লেখা আরম্ভ করতেই যে-রেটে হাংরি আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা চলছে তা সুভাষ-প্রদীপ-শৈলেশ্বর এই কুড়ি বছর ঘষাঘষি করা সত্বেও হয়নি । এঁরা যাঁরা একদিন এসট্যাবলিশমেন্টের তরফে সাক্ষ্য দিয়ে হাত পেতে পয়সা নিয়েছিলেন, দু-চার পাতা লিখে নিজেদের প্রমাণ করতে চাইছেন প্রতিষ্ঠানবিরোধী । কী অবস্হা ! আমি নিজেকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী বলতে চাই না । আমি মলয় রায়চৌধুরী । আমার ভাবনাচিন্তার জন্য প্রতিষ্ঠানই আমার বিরোধিতা করে ।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ )। কথাটা সম্পূর্ণ সত্য । মলয় রায়চৌধুরী দীর্ঘ দিন স্বেচ্ছায় লেখা থেকে বিরত থাকার ফলে হাংরি আন্দোলন বিষয়ক আলোচনা স্তিমিত হয়ে আসে । তিনি যখন নিজেকে মলয় রায়চৌধুরী হিসেবে পরিচয় দিতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ তখন প্রতিষ্ঠানই তাঁকে প্রতিষ্ঠানবিরোধী আখ্যা দেয় । এতেই মলয় রায়চৌধুরী হয়ে ওঠেন স্বতন্ত্র, সম্পূর্ণ আলাদা । তাই দ্রোহপুরুষের ফরমান — যতদিন বেঁচে থাকা ততদিন কবিতা ও গদ্যের চাকুতে একনাগাড়ে পালিশ দেয়া আবশ্যক ।

মলয় রায়চৌধুরী সৃষ্ট হাংরি আন্দোলনে প্রভাবিত হয়ে পঞ্চাশের দশকের অন্যতম সাহিত্যিক সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় হাংরি আন্দোলনে যোগ দেন । “আমি হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে ভীষণভাবেই জড়িত ছিলাম । হাংরি আন্দোলনের আদর্শ আমার ভালো লেগেছিল এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম। এ-ব্যাপারে আমার কোনো দ্বিমত নেই ।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ ) । এ সম্পর্কে দেবী রায় কী বলেন শোনা যাক — “হাংরি জেনারেশন আন্দোলনের প্রতি প্রত্যক্ষভাবে মনেপ্রাণে ইষ্টমন্ত্রের সমান বিশ্বস্ত থাকাই আমার একমাত্র ভূমিকা ছিল ।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ )।

হাংরি আন্দোলন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আন্দোলন । অনিল করঞ্জাইয়ের মতে, “হাংরি আন্দোলন ছিল পৃথিবী জুড়ে এই শতাব্দীর একটি সদর্থক, গভীর ও অর্থবহ আন্দোলন।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ )। হাংরি আন্দোলনের প্রভাব যে বাংলা সাহিত্যে গভীরভাবে  বিস্তার লাভ করে আজ তা অনেকেই মান্যতা দেন । অরুণেশ ঘোষ বলেছেন, “হাংরি লেখা নিশ্চয়ই সাহিত্য । কিন্তু প্রথাগত বাংলা লেখালিখি, এমনকি জীবনানন্দের থেকেও সম্পূর্ণ ভিন্নরকম বলে এখনও এই সাহিত্য মূল স্রোতের সাথে পুরোপুরি মিশে যেতে পারেনি । তবে এর একটা ছাপ পড়েছে এই সময়ের লেখালিখিতে । প্রবল ভাবেই পড়েছে।” ( পদ্যগদ্য সংবাদ )। কথাটা অনেকেই স্বীকার করেন । কেননা, বাংলা কাব্য এবং গদ্য হাংরি আন্দোলন-পুর্ববর্তী সময়ে যেভাবে, যে বিষয় নিয়ে, যে আঙ্গিকে চলছিল, হঠাৎ সম্পূর্ণ রুট পরিবর্তন করে ফেলল৷